ব্রেকিং নিউজ

জটিলতা হচ্ছে মুদ্রণে, সংশোধন করা হচ্ছে পাঠ্যবই

শিক্ষা

উচ্চ মাধ্যমিকের (এইচএসসি) ক্লাস শুরুর বাকি মাত্র দেড় মাস। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারি তত্ত্বাবধানে থাকা তিনটি পাঠ্যবই সংশোধন এবং মুদ্রণ ও বাজারজাতের টেন্ডার প্রক্রিয়াই শেষ হয়নি। নকল বই বাজারজাত ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় এবারের টেন্ডার প্রক্রিয়া বর্জন করে গত কয়েক বছর ধরে এই কাজ পাওয়া ১৭ প্রতিষ্ঠান।

যে চারটি প্রতিষ্ঠান এবার টেন্ডারে অংশ নিয়েছে তার মধ্যে আবার দুটিই নবীন। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নকল বই বাজারজাতের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনোটির বিরুদ্ধে সারা দেশে বই বাজারজাতের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এ অবস্থায় বই মুদ্রণ ও বাজারজাত প্রক্রিয়া শুরুতেই জটিলতায় পড়েছে। এরফলে ১ জুলাইয়ের আগে বই বাজারজাত করা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছে সাড়ে ১৭ লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ৯ লাখ বই মুদ্রণ ও বাজারজাতের টেন্ডার দিয়েছে।

এতে একদিকে বাকি সাড়ে ৮ লাখ বই নকলের রাস্তা তৈরি করে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে এর ফলে সরকার অন্তত পৌনে ২ কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হবে।

সরকার এইচএসসির বাংলা, বাংলা সহপাঠ এবং ইংরেজি বই প্রকাশকদের মাধ্যমে বাজারজাত করে। বাকি বইগুলোর শুধু কারিকুলাম করে দেয় সরকার। ওই কারিকুলামের আলোকে লেখা বই প্রণয়ন ও বিক্রি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

জানা গেছে, এর মধ্যে বাংলা ও ইংরেজির বিষয়বস্তু ট্রাইআউট (সারা দেশের শিক্ষকদের মতামত নেয়া) প্রায় দু’বছর আগে শেষ হয়েছে। এর আলোকে উভয় বইয়ের গদ্য-পদ্যসহ পাঠ পরিবর্তন ও হালনাগাদ হওয়ার কথা। কিন্তু দু’বছরেও শেষ হয়নি সে কাজ। ফলে এবারও আগের বই শিক্ষার্থীদের হাতে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা যুগান্তরকে বলেন, এইচএসসির ৩টি বই মুদ্রণ ও বাজারজাতে টেন্ডার হয়েছে। এতে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনটি নকলবাজ আর কোনটি নয়, তা নাম দেখে বোঝা সম্ভব হয়নি। তারা বই সারা দেশে বাজারজাত করতে পারবে কিনা সেটাও আগাম জানা সম্ভব নয়। টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি এসব দেখবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ট্রাইআউটের প্রতিবেদন নিয়ে মূল্যায়নসহ পরবর্তী কার্যক্রম চলছে। মুদ্রণের আদেশ দেয়ার আগে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কাজ শেষ হলে হয়তো সংশোধিত বই এবার যাবে।

সম্ভাব্য সংকট আঁচ করতে পেরে ১৬ মে এনসিটিবিতে বৈঠক ডাকা হয়। সেখানে গতবছর বই মুদ্রণে অংশ নেয়া ১৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা যোগ দেন।

সূত্র বলছে, এনসিটিবির পক্ষ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ নিতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে টেন্ডারে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেয়ার বিকল্প নেই।

একাধিক প্রকাশক যুগান্তরকে বলেন, বুঝে হোক আর না বুঝেই হোক- এনসিটিবি নকলকারীদের সঙ্গে মিলিয়ে আমাদের বইয়ের কাজ দিতে চাচ্ছে এখন। কোনো বৈধতা ছাড়াই যেসব প্রতিষ্ঠান নকল বই বাজারে ছাড়ে, সেসব প্রতিষ্ঠানের হাতে বই ছাপানোর লাইসেন্স থাকলে তারা আসলের চেয়ে নকল বই-ই বেশি বিক্রি করবে। তাদেরকে কোনো প্রক্রিয়ায়ই ধরার সুযোগ থাকবে না। তাই জেনেশুনে এমন ফাঁদে পা দিতে চাই না। ফলে মুদ্রণের কাজ নেয়ার এনসিটিবির অনুরোধে সাড়া দিতে পারিনি।

একজন প্রকাশক বলেন, এসএসসিতে এবার পাস করেছে সাড়ে ১৭ লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু ৯ লাখ বই মুদ্রণের টেন্ডার হয়েছে। বাকি বইগুলো নকল বিক্রি হবে- সরকারি সংস্থা এটা ধরে নিয়েই কাজে নামছে। কিন্তু আমাদের দাবি ছিল, নকল বন্ধে এনসিটিবি যদি সক্রিয় হয় তাহলে চ্যালেঞ্জ নিতে আমরা প্রস্তুত। সংস্থারটির অতীতের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এনসিটিবি মাত্র ৪টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবার পাঠ্যবই বাজারজাত করার ঝুঁকি নিয়েছে। কাজটি দুঃসাধ্য। বাজারে বইয়ের কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে। ফলে শিক্ষার্থীদের চড়া দামে বই কেনার শঙ্কাও আছে।

উল্লেখ্য, প্রতিটি বই থেকে এনসিটিবি রয়্যালিটি হিসেবে মূল্যের ১১ শতাংশ পেয়ে থাকে। সে হিসাবে ৯ কোটি বই থেকে প্রায় ৯৯ লাখ টাকা পাবে। এছাড়া প্রতিটি বইয়ের ‘নিরাপত্তা কাগজ’ বিক্রি করে পাবে আরও এক কোটি টাকা। অপরদিকে সাড়ে ৮ লাখ বই কম ছাপানোর কারণে রয়্যালিটি এবং নিরাপত্তা কাগজ বাবদ কমপক্ষে পৌনে ২ কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে সরকার। প্রকাশকরা বলছেন, নকল বই রোধ করতে পারলে কেবল প্রকাশকরা নন, সরকারও লাভবান হয়।

ট্রাইআউট ও বাংলা বই : ২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুযায়ী ২০১২ সালে নতুন কারিকুলাম তৈরি করে সরকার। তার আলোকে ২০১৪ সালে বাংলা প্রথমপত্র (পদ্য, গদ্য, উপন্যাস ও নাটক) এবং ২০১৫ সালে ইংরেজি প্রথমপত্র বই নতুনরূপে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হয়। কোনো বিষয়ে নতুন পাঠ্যবই প্রবর্তিত হলে তারপর ক্লাসে পাঠদানকারী শিক্ষকদের কাছ থেকে মতামত নেয়া হয়। এর নাম ট্রাইআউট।

গত বছর ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষকদের কাছ থেকে তেমন মতামত নিয়ে দুটি বিষয়ে আলাদা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। তাতে নানা সুপারিশ আছে। এরমধ্যে বাংলা বইয়ের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আপত্তি দিয়েছেন শিক্ষকরা।

সুপারিশে বলা হয়, শিক্ষকরা বইটির নামকরণ লেখায় ভুল ধরে বলেছেন এর নাম ‘সাহিত্য পাঠ’ না লিখে এক শব্দে ‘সাহিত্যপাঠ’ লিখতে হবে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জসীমউদদ্ীন এবং সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা বই থেকে বাদ দেয়ায় শিক্ষক-অভিভাবকদের হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা মীর মশাররফ হোসেন, ফররুখ আহমদ এবং প্রমথ চৌধুরীর লেখাও পাঠ্যবইয়ে ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করেন। এসব লেখক-সাহিত্যিকের রচনা বাদ দেয়ায় এনসিটিবির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষকরা বিষোদগার করেন বলেও প্রতিবেদনে বলা আছে।

সুপারিশে বলা হয়েছে, সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও পাঠ্যগ্রন্থে কতিপয় লেখকের রচনা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। তাদের মধ্যে, অন্নদাশঙ্কর রায়, হুমায়ূন আহমেদ, বিহারীলাল চক্রবর্তী, ডিএল রায়, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাঠ্যগ্রন্থে নারী লেখকদের মাত্র দুটি রচনা রয়েছে, এতে লিঙ্গবৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই নারী লেখকের আরও লেখা যুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।

সিলেবাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর সিলেবাস অনেকে বৈচিত্র্যহীন। এতে গদ্যে মননশীল ও সুচিন্তিত প্রবন্ধের অভাব আছে। ‘জীবন ও বৃক্ষ’ প্রবন্ধের মতো একই মানের আরও প্রবন্ধ থাকা উচিত। বিশেষ করে প্রমথ চৌধুরী কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা অনেকে দেখতে চান।

নৈতিকতা, দেশাত্মবোধ, মুক্ত ও উদার মানস গঠনের উপযোগী রচনার সন্নিবেশ থাকার পক্ষে জোরালো মত দেয়া হয়েছে। কবিতার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যহীনতার বিষয়টি অনেক বেশি। দুটি কবিতার নাম উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওইগুলো শিক্ষকদের তেমন টানে না।

তিনটি কবিতা উল্লেখ করে বলা হয় যে, ওইগুলোর ভাববিষয় একই। এছাড়া বানান, শব্দ গঠন ও প্রয়োগে ভুলভ্রান্তির কথা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ‘কার’ প্রয়োগ এবং বিদেশি শব্দের বানানে অভিন্নতা নষ্টের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক প্রকাশনা সমূহ

   সাম্প্রতিক খবর



»