ব্রেকিং নিউজ

থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়

একবার এক লোককে জমিদার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘খাওয়াদাওয়া কেমন চলছে?’ লোকটি জবাব দিলেন, শজনের ডাঁটার চচ্চড়ি, কলাগাছের থোড়ের ঝোল, ডাল আর মিষ্টিকুমড়ার বড়া। জমিদার বললেন, এর আগেও তো ওই একই কথা শুনেছি। লোকটি বললেন, ‘ওই হলো, থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়।’

কোনো অবস্থা যখন আগে-পরে একই রকম এবং বৈচিত্র্যহীন, তখন তাকে থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড় বলাই যায়।

ফিচার হেডিংটি রমাকান্তকামার এর মতো। যাদের জানা নেই তারা ‘রমাকান্তকামার’ শব্দটি উল্টো করে লিখে দ্যাখেন। কি দাড়ায়? যতোই উল্টান-পাল্টান রমাকান্তকামার, রমাকান্তকামারই থাকে।

থোড় বড়ি খাড়া বা খাড়া বড়ি থোড় প্রবাদটি বাংলাদেশের কোন একটি অঞ্চলের খুব প্রচলিত আঞ্চলিক প্রবাদ। যদিও এর উৎপত্তি কাল বা অঞ্চল সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। তার প্রয়োজনও নেই। এমনকি যা বলতে চাচ্ছি তার জন্য উল্লেখিত শব্দগুলির অর্থ জানার বিষয়টিও অপ্রয়োজনীয়।

অর্থ জানা না থাকলে পাঠকের মধ্যে একটা খুঁতখুঁতানি কাজ করতে পারে। আমার যেটা হয়। এজন্য অপ্রয়োজনীয় হলেও অর্থটা বলে তারপর মূল বক্তব্য শুরু করি। 

‘থোড়’ হচ্ছে কলার কাঁধির মাঝের মোটা দন্ডের গাছের ভিতরে থাকা সাদা থকথকে টিউবলাইট সদৃশ্য দন্ড বা দন্ডাংশ। ‘বড়ি’ হলো কুমড়া আর মসুরের ডাল আচ্ছামতো মিক্সিং করে  বিশেষভাবে বানিয়ে কড়া রোদে শুকিয়ে তৈরী শক্ত গুটিরমতো তরকারী বিশেষ। যা আমার ছেলে/মেয়ে/স্ত্রীর খুব পছন্দ। আমার ভাল্লাগে না। গন্ধই সহ্য করতে পারি না, ভাললাগাতো পরের কথা। ‘খাড়া’ মানে সজনের ডাঁটা। উল্লেখিত তিনটি জিনিসই তরকারী হিসেবে খাওয়া হয়। 

থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড় হলো অনেকটা ‘যে লাউ সেই কদু’ বোঝানোর মতোই আরেকটি আঞ্চলিক প্রবাদ। প্রবাদটি ‘খোল নলচা’ আঞ্চলিক প্রবাদের ঠিক উল্টোরূপ প্রকাশ করে। ‘খোল নলচা’ হলো বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের বহু ব্যবহৃত একটি আঞ্চলিক প্রবাদ, যার মানে হলো কৃত বিষয়টি সম্পুর্ণ নতুন করে পুনরায় করা অর্থাৎ ঢেলে সাজানো। অর্থ প্রকাশের সাথে সঙ্গতি রেখে এটিকে ‘কেঁচে গন্ডুস’ও বলা যায়। উদাহরণের জন্য উদাহরণ দেওয়া, এটি আজকের মূল বক্তব্য নয়।

ব্যক্তিটি খুব ধর্মপ্রাণ, এর মানে কি? তিনি কায়দামতো তার ধর্ম-কর্ম পালন করেন, নিয়মিত উপসনালয়ে যান এবং ধর্মের আলো ছড়ানোর জন্য বহুত ‍নিবেদিত অন্তপ্রাণ ব্যক্তি! তার দ্বারা সমাজের কোন ক্ষতি হয় না! তিনি অন্য ধর্মের প্রতিও সহনশীল! সকল ধর্মকে সমান চোখে দ্যাখেন! সকল মানুষকে তিনি মানুষ হিসেবেই দ্যাখেন, ধর্মীয় দৃষ্টিতে দ্যাখেন না! নারী-পুরুষের অধিকারের ব্যপারে তিনি অত্যন্ত সজাগ। যে কোন মানুষই সবার আগে মানুষ তারপরে অন্য কিছু, এই নীতিতে তিনি বিশ্বাস করেন এবং এটিই পালন করেন। …ইত্যাদি ইত্যাদি। যাই হোক, এগুলিই যদি মূল উপজীব্য হয়, তবে আর কেন প্রচলিত ধর্ম পালন?  নির্দৃষ্ট ধর্মের প্রতি অতি-আস্থাবান হয়ে তাকে রক্ষার্থে এবং প্রতিষ্ঠাকল্পে এতো মারামারি-কাটকিাটি করার দরকার কি? সকল ধরর্মর অধিকার সমান রাখার জন্য নির্দিৃষ্ট ধর্মের প্রতি আনুগত্ত থাকার বিষয়টি যে, ‘বিচার মানি – তালগাছ আমার’, সেটি আর নতুন করে বলে চর্বিত-চর্বণ করার প্রয়োজন নাই। এই হামবড়া-ভাব বহন ও প্রয়োগের বিষয়টি ধর্মের সেই আদি-প্রচারকাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে প্রত্যক্ষকৃত এবং স্বমহিমায়(!) প্রতিষ্ঠিত। দেখার চোখ থাকলেই যা দেখা যায়। চোখে ধর্মের ঠুলি থাকলে দেখা য়ায় না।

ধর্মের প্রয়োজনে জীবন বিলিয়ে দেওয়া নিশ্চয়ই ধর্মপ্রাণতার পক্ষে সবচেয়ে বড় স্যকরিফাইস! নয় কি? কোন কারণে সে প্রাণ দেওয়া যদি হয় ধর্মের জন্য সংগ্রাম করে, তাহলেতো কথাই নেই! একেবারে শহীদ। বাঁচলেও পুরস্কার, বিরাট গালভারা উপাধির সুবিধাভোগি সম্মান – ‘গাজী’।

এখানে একটু হিসেব আছে। ধর্মের জন্য কারা প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছে এবং কোথায় বিসর্জন দিচ্ছে? যারা দিচ্ছে, তারা কি ধর্মান্তপ্রাণ মুমিন নয়? চুপচাপ গোবেচারারমতো ধর্ম পালন করার থেকে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামে নিযুক্ত থাকা কি ধর্মান্তপ্রাণতার উৎকৃষ্ঠ ও প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ নয়? নিশ্চয়ই তাই। যুগযুগ ধরে ধর্মের সহিংস বিকাশ-ধারা সে কথাই বলে। ধর্মগ্রন্থসমুহে ধর্ম প্রতিষ্ঠার নির্দেশনাও সে প্রমানই বহন করে। ধর্মের পক্ষে সংগ্রামরতরাও জোর দিয়ে এই কথাই বলে যাচ্ছে। যেখানে কিয়ামাত পর্যন্ত লড়াই করার সুস্পষ্ট নির্দেশ, সেখানে কেনই বা বলবে না? যখনই বিষয়গুলি বর্তমান সমাজে বিরাজিত বিজ্ঞানভিত্তিক সভ্যতার তুলনায় নৃশংস হয়ে ধরা পড়ছে, তখনই বলা হয়, এটা ধর্ম নয়, ধর্ম এটা বলেনি…ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ সমস্ত ধর্মজোসী জিহাদীরা কিসের উপরে ভরসা করে জীবন দিচ্ছে? তাদের এই ডিভোশনের পেছনের মূল ক্যরিসমাটা কি? এরা কি আসলেই জীবন দিচ্ছে, নাকি নিচ্ছে? প্রত্যক্ষ অবস্থাটা কি বলে?

প্রকৃতঅর্থে এই ধর্মজোসী জিহাদী গোষ্ঠি তাদের নিজেরমতো করে আত্ম-ব্যাখ্যা বানিয়ে অন্যকে দোষি সব্যস্ত করে এবং তাদের স্বনির্ধারিত দোষের পক্ষে নিজেরাই একটা আত্ব-ব্যাখ্যেও শাস্তি নির্ধারণ করে, এরপরে প্রচলিত আইন-কানুনেনর প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, তারা নিজেরাই স্ব-নির্ধারিত শাস্তি দেবার জন্য সর্বশক্তি প্রযোগ করতে এগিয়ে যাচ্ছে। নির্বিরোধ, নির্বিবাদী, অহিংস লোকজনসহ প্রাণহীন ক্লীব-সম্পদ কোন কিছুই তাদের ধ্বংসযজ্ঞকৃত লক্ষ্যেবস্তুর বাইরে নয়। অতঃপর এসব রক্ষার দায়ত্বে থাকা সরকারী যন্ত্রসমুহ নির্বিবাদী জান-মাল রক্ষার জন্য মাঠে নামে। তখনই বাঁধে  প্যাচাল ও ক্যাচাল। মনুষ্য-মস্তিস্কের দোহাই দিয়ে, করজোড় করে ওদের থামতে বললেও ওরা থামে না। উল্টো জেহাদী জোসে বীর-বিক্রমে ঝাপিয়ে পড়ে প্রাণহানিসহ ক্লীব-সম্পদ বিনষ্টের মহাযজ্ঞে। সরকারী যন্ত্রের কি আর করা! অহিংস পথ বিফল হবার পরে বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত বল প্রযোগের মাধ্যমে জেহাদী জোস দমন করে রাষ্ট্রীয় জানমাল রক্ষার প্রাণান্ত চেষ্টা। এ চেষ্টার অংশ হিসেবেই বলি হয় ধর্মজোসী জিহাদী। ইহলীলা সাঙ্গ হয়ে কাঙ্খিত হুরপরী প্রাপ্তিই হয় তাদের স্খায়ী ঠিকানা। উপায় নাই।  

জিহাদ করে এভাবে জীবন দেবার বিষয়টি কি শুধুই পরকালের নেশায়? রিয়েলিটি কি তাই বলে? মনে হয় না! বাস্তবে এমনটি প্রতীয়মান নয়। তাহলে বাস্তবে প্রতীয়মান প্রকৃত বিষয়টি কি?

যেখানে নিরেট ধর্ম পালনকারী গোবেচারা টাইপের মুমিনদের প্রাধান্য বেশী সেখানেই শুধু ধর্ম-সংগ্রামী হয়ে জীবন দেবার জেহাদী জোসটি লক্ষ্যনীয়। যেখানে মুমিন কম সেখানে এটি ঘটে না। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, রাশিয়া, চীন …এত্যাদি দেশে এসব সেই মাত্রায় ঘটে না। কেন ঘটে না? মুমিনতো সেখানেও আছে। ঘটেনা, কারণ সেখানে মুমিন কম। দলভারী না হলে জেহাদী জোস আসে না, তাই ধর্ম যতই গোল্লায় যাক। তবে হ্যাঁ, ঐ সমস্ত দেশেরও কিছু কিছু যায়গায় মাঝেমধ্যে জেহাদী জোস ফুসে ওঠে। কোন সে যায়গাসমুহ? যেখানে মুমিনদের প্রাধান্য আছে, সে সমস্ত যায়গাসমুহ। যেখানে মুমিন নেই সেখানে একেবারেই শান্ত। তারমানে, মুমিনশুন্য সমান সমান ক্যাচাল শুন্য। এখানে ক্যাচাল ও মুমিন সমানুপাতিক। আবার যেখানে মুমিন বেশী, সেখানে ক্যাচালও বেশী। এখানেও ক্যচাল ও মুমিন সমানুপাতিক অর্থাৎ মুমিন বেশী হলে ক্যচাল বেশী হয়।  

নিত্তদিন জেহাদী জোসে পাইকাড়ীহারে যে জেহাদী-মুমিন বান্দারা মারতে এসে মরছে, এগুলো কোথায় কোথায় মরছে? কয়েকটির নাম বলি, পাকিস্থান, আফগানিস্থান, ইরাক, ইরান, মিশর, সিরিয়া, প্যালেষ্টাইন, লেবানন, নাইজেরিয়া, জর্দান, লিবিয়া, লাইবেরিয়া, ভারত অধীকৃত কাশ্মির, বাংলাদেশ এবং ব্ল্যা ব্ল্যা ব্ল্যা! কি দাড়ালো? যেখানে মুমিন বেশী সেখানেই জেহাদী জোসের এ্যপ্লিকেশন মারাত্মক। যেখানে মুমিন কম, সেখানে এ্যপ্লিকেশনও কম। তাহলে জেহাদীদের মানষিক শক্তির প্রকৃত উৎস কি? মানষিক শক্তির উৎস হলো ঐ সংখ্যাগরিষ্ট অহিংস মুমিনগোষ্ঠি। যারা আপাততঃ গোবেচারা, শুধুমাত্র নিরেট ধর্ম পালনকারী, তারা। এরা আছে বলেই ওরা জেহাদী। ওদের মানষিক জেহাদী শক্তির অবিরত যোগানদাতা এই অহিংস মুমিনগোষ্ঠির নীরব উপস্থিতি। জেহাদী ভেসে আসে না, তৈরী হয়, এই অহিংস মুমিনগোষ্ঠি থেকেই তৈরী হয়। সুতরাং সমাজে ধর্মের উপস্থিতিই আসলে এ হিংস্রতার জন্য দায়ি।   

অহিংস মুমিনগোষ্ঠি কি আসলেই অহিংস অথবা নীরব-গোবেচারা? মাষ্টার সাহেবকে দারোগার চেয়ারে না বসালে তার সততার মাপকাঠি নিধারণ করা কঠিন। শান্তিপ্রিয় মুমিনগোষ্ঠির ক্ষেত্রেও তেমন। গোবেচারা আবুল আবুল চেহারা নিয়ে আপনার আমার চারিদিকে যারা আছেন – স্থান, কাল, পাত্র ও অবস্থাভেদে সে সব মুমিনরা দারোগার চেয়ার পেলে কি করতে পারে তা যুগযুগ ধরে প্রমানীত। মুমিন কখনও অহিংস হয়না, তাদের অহিংসা হিংস্র হবার সুযোগের অপ্রতুলতা মাত্র। অহিংস মুমিন আর হিংস্র মুমিনের মধ্যে মানবিক-দৃষ্টিভঙ্গিগত কোন পার্থক্য নেই, স্থান, কাল, পাত্র ও অবস্থাভেদে একটি আরেকটির রুপান্তর ও পরিপূরক মাত্র। এই নির্দোষ ধর্মপ্রাণতার উপস্থিই ধর্মবাদী সমাজের প্রায়-সকল অযৌক্তিকতার ভিত্তিমূল এবং তার বাস্তবায়ক। নির্দোষ ধর্মপ্রাণই বলি আর হিংস্র ধর্ম ব্যবসায়িই বলি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা একই; থোড় বড়ি খাড়া অথবা খাড়া বড়ি থোড়। (যুক্তিযুক্ত)

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক প্রকাশনা সমূহ

   সাম্প্রতিক খবর



»