ব্রেকিং নিউজ

নিদারুণ অসহায়ত্বের এক জীবনকাহিনি

অসহায়ত্বের এক জীবনকাহিনি

সুফিয়া খাতুনের সঠিক বয়সটা কেউ বলতে পারেন না। তবে ১০০ না হলেও কাছাকাছি বলেই সবার অনুমান। ভিটেমাটি কিছুই নেই। ছেলেমেয়ে দুজন; তবে তাঁরাও বয়সের ভারে ন্যুব্জ। সংসার চলে কষ্টে। শেষ পর্যন্ত মাকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে এসেছিলেন তাঁরা। তবে সুফিয়াকে কুড়িয়ে এনে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। চিকিৎসার পাশাপাশি অন্যান্য বন্দোবস্তও হয়ে যাচ্ছে তাঁর। 

বৃদ্ধা সুফিয়া কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার নছরুদ্দি এলাকার বাসিন্দা। গত সোমবার রাতে সুফিয়াকে উপজেলার গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার সড়ক থেকে উদ্ধার করা হয়।

 পরিবারসূত্রে জানা গেছে, সুফিয়ার স্বামী কালাই মিয়া মারা গেছেন প্রায় ২০ বছর আগে। পরিবারটির এক শতক জমির ওপরে একটা ঘর ছাড়া কিছুই ছিল না। সেটিও এখন আর নেই। একমাত্র ছেলে মোখলেছুর রহমানও বর্তমানে বয়োবৃদ্ধ। তিনি বসতভিটার নিজের অংশটি পাঁচ বছর আগে বিক্রি করে দেন একমাত্র বোন মিনা আক্তারের কাছে। এরপর থেকে মোখলেছুর বাস করেন মেয়ের বাড়িতে। 

মোখলেছুর রহমান বলেন, দারিদ্র্য তাঁদের নিত্যসঙ্গী। অভাব-অনটন দেখে তাঁর স্ত্রী ৯ বছর আগে সৌদি আরবে চলে গেছেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না। তিনি বর্তমানে বাসে চানাচুর বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। থাকেন মেয়ের বাড়িতে। এমন পরিস্থিতে মা সুফিয়াকে নিজের কাছে রাখতে পারেননি। বোন মিনার সঙ্গে থাকতেন।

এদিকে সুফিয়ার একমাত্র মেয়ে মিনাও এখন বয়োবৃদ্ধ। তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন উপজেলার গঙ্গাপ্রসাদ গ্রামে। নছরুদ্দি গ্রামের পৈতৃক ভিটা তিনিও বিক্রি করে দিয়েছেন। মিনার কাছেই এত দিন ছিলেন বৃদ্ধা মা সুফিয়া। দারিদ্র্যের কারণে এই মিনাই তাঁর মা সুফিয়াকে সোমবার রাস্তার পাশে ফেলে এসেছিলেন।

এ বিষয়ে মিনা বলেন, বয়স হয়ে যাওয়ায় তিনি নিজে কোনো কাজ করতে পারেন না। তাঁর স্বামী আবদুল মান্নানও বৃদ্ধ। কোনো উপার্জন করতে পারেন না। মান্নানের আগের পক্ষের এক ছেলে আছে। এখন তাঁর আয়ে কোনোমতে সংসার চলে। খুবই অসহায় তাঁরা।

বৃদ্ধা সুফিয়া চোখে দেখেন না। কানেও কম শোনেন। তাঁকে সোমবার ফেলে আসা হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর এলাকায়। প্রথমে তিনি কিছু বুঝে উঠতে পারেননি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও কাউকে কাছে না পেয়ে চিৎকার শুরু করেন। খবর পেয়ে দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে যান। তিনি সুফিয়াকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে সুফিয়ার স্বজনদের খোঁজে নামে উপজেলা প্রশাসন। তাঁর ছেলে মোখলেছুর রহমান এবং নিকটাত্মীয় হিসেবে ভাইয়ের ছেলে আবদুল বাতেনকে পাওয়া যায়। তাঁদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেকে এনে কথা বলেন ইউএনও। তিনি পরিবারটির অসহায় অবস্থার কথা জানতে পারেন। আরও জানতে পারেন, সুফিয়া এখন পর্যন্ত কোনো বিধবা বা বয়স্ক ভাতা পান না। ইউএনও তাৎক্ষণিকভাবে সুফিয়াকে বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেওয়ার পাশাপাশি ১ লাখ টাকা মূল্যের একটি সরকারি বসতঘর, হুইলচেয়ার এবং বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার আশ্বাস দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ সেলিম শেখ, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শাহীনুর আলম এবং হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন।

কর্মকর্তা শাহীনুর আলম বলেন, সুফিয়া খাতুন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ। তবে মানসিকভাবে বেশ বিপর্যস্ত। তাঁকে সুস্থ করে তুলতে সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক প্রকাশনা সমূহ

   সাম্প্রতিক খবর



»