ব্রেকিং নিউজ

শিখণ্ডী খাড়া করা (প্রবাদটির উৎস ও অর্থ)

৩৫তম বিসিএস-এর বাংলা প্রশ্নটি দেখছিলাম। সেখানে এই প্রবাদটির অর্থ নিয়ে একটি প্রশ্ন এসেছিল। প্রবাদটির অর্থ বলার আগে এর পেছনের কাহিনী জানা থাকলে বুঝতে সহজ হবে। তাই কাহিনীটা আগে বর্ণনা করছি।

কাহিনীঃ
আমরা জানি যে পৃথিবীতে যে চারটি জাত মহাকাব্য (রামায়ন,মহাভারত,ইলিয়াড,ওডেসি) আছে তার মধ্যে মহাভারত অন্যতম। যে দুজন মহারথীর ( বীরদের মধ্যে অন্যতম) মহাপাপের ফলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম হলেন মহাবীর ভীষ্ম। আর আরেকজন হলেন অস্ত্র গুরু দ্রোণ। দূর্যোধনের অন্যায় দেখেও নিজেদের প্রতিজ্ঞার নাগপাশে আঁটকে পরা গুরু দ্রোণ আর মহাবীর ভীষ্মের নির্লিপ্ততার পরিনাম-ই মহাভারতের ভয়াবহ যুদ্ধ ডেকে নিয়ে আসে । উল্লেখ্য যে পান্ডব এবং কৌরব, উভয় বংশের পিতামহ বলে ইনি পিতামহ ভীষ্ম নামেও পরিচিত।আমরা যারা মহাভারতের কাহিনী অল্পবিস্তর জানি, আমাদের চোখে বীর বলতে অর্জুন, মহাবীর দাতা কর্ণ এদের কথা ভেসে আসলেও। পিতামহ ভীষ্মের বীরত্বের কাছে তাদের বীরত্ব ছিল শিশু পর্যায়ে।

কুরু বংশের রাজা শান্তনু ও দেবী গঙ্গার অষ্টম পুত্র হলেন ভীষ্ম। যদিও জন্মসূত্রে তাঁর নাম দেবব্রত। দেবব্রত (ভীষ্ম) দেবগুরু বৃহস্পতির কাছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বশিষ্ঠ মুনির কাছে বেদ ও বেদাঙ্গ এবং পরশুরামের কাছে ধনুর্বিদ্যা শিখে একজন আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠেন। কিন্ত পিতার সম্মান রক্ষার্থে তিনি কুরু বংশের তাঁর প্রাপ্য সিংহাসন ত্যাগ করেন এবং কখনো বিয়ে করবেননা বলে তাঁর পিতাকে প্রতিজ্ঞা করেন। মূলত তাঁর এই ভীষণ প্রতিজ্ঞা গ্রহণ এবং তা সর্বাত্মকভাবে পালন করার জন্য তিনি ভীষ্ম নামে ভূষিত হন। আর তাঁর পিতা শান্তনু তাকে ইচ্ছামৃত্যুর বর দেন। ভীষ্ম সিংহাসন আরোহন আরোহন না করায় তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই বিচিত্রবীর্য সিংহাসন আরোহণ করেন।

একবার কাশী রাজ্যের রাজা তাঁর তিন কন্যা অম্বা, অম্বিকা আর অম্বালিকাকে পাত্রস্থ করার জন্য স্বয়ংবর সভার আয়োজন করেছিলেন। ভীষ্ম তাঁর বীরত্বের দ্বারা কাশীরাজের তিন কন্যাকে অধিকার করেছিলেন। ভীষ্ম অম্বিকা আর অম্বালিকাকে তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই কুরুরাজ বিচিত্রবীর্যের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন।কিন্ত বড় বোন অম্বা প্রথমে শাল্বরাজ ও পরে ভীষ্মকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্ত ভীষ্ম চিরকুমার থাকবেন বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। অপমানিত অম্বা ভীষ্মকে বধ করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়ে মহাদেবের তপস্যা করেন। অম্বার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাকে বর দেলেন “ হে অম্বা বিনা কারনে/অপরাধে আমি কাউকে মৃত্যুর অভিশাপ দিতে পারিনা, কিন্ত যেদিন ভীষ্মের মনে স্বেচ্ছ্বা মৃত্যুর ইচ্ছে উদয় হবে সেদিন তুমি তাঁর মৃত্যুর কারন হয়ে তাঁর সামনে উপস্থিত হবে”। এই বর পাবার পর অম্বা আগুনে প্রাণ বিসর্জন দেন।

পরজন্মে অম্বা পাঞ্চাল দেশের (সম্ভবত অধুনা ভারতের উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের কিছু অংশ জুড়ে ছিল পাঞ্চাল) রাজা দ্রুপদের ঘরে শিখন্ডিণী নামে কন্যারূপে জন্মগ্রহন করেন। কথিত আছে তিনি ক্লীব ছিলেন কিন্ত প্রকাশ্যে পুরুষ বলে পরিচিত ছিলেন। দশার্ণ দেশের রাজকুমারীর সাথে তার বিয়ে হয়। কিন্ত স্ত্রীর কাছে তার পুরুষত্বহীনতার বিষয় প্রকাশিত হয়ে পড়লে তিনি লজ্জায় বনে গমন করেন। সেখানে কুবেরের অনুচর স্থূলকর্ণ নামক যক্ষের সাথে তার দেখা হয়। বিস্তারিত জানার পর স্থূলকর্ণ শিখন্ডিনীকে তার পৌরুষ দান করে ক্লীবত্ব গ্রহন করেন। পৌরুষ প্রাপ্ত হয়ে শিকন্ডিনী হলেন শিখন্ডী। মহাভারতের উদ্যোগ পর্ব অনুযায়ী শিখন্ডীর মৃত্যুর পর স্থূলকর্ণ পুনরায় ক্লীব থেকে পুরুষ হবেন এমন-ই সিদ্ধান্ত ছিল।

শিখন্ডী তার বাবার কাছে (পাঞ্চালের রাজা দ্রুপদের নিকট) ফিরলেন। পুরুষ বলে প্রমাণিত হলেন তিনি। দ্রোণাচার্যের কাছে তিনি অস্ত্রবিদ্যা ও ধনুর্বেদ শিক্ষা করেন এবং দক্ষ যোদ্ধায় পরিণত হন। যদিও শাস্ত্রজ্ঞ পন্ডিত এবং দক্ষ রাজনীতিবিদ ভীষ্ম জানতে পারেন যে অম্বাই শিখন্ডীরূপে পরিণত হয়েছে এবং তাঁকে বধ করার জন্য পুণর্জন্ম নিয়েছেন। যৌবনে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা ছিল যে তিনি স্ত্রীলোক, ক্লীব, স্ত্রীলোক থেকে রূপান্তরিত পুরুষ এবং অস্ত্রহীন-এদের বিরুদ্ধে তিনি কখনো যুদ্ধাস্ত্র প্রয়োগ করবেন না।
কুরুক্ষেত্রের মহাসমরে (১৮ দিন যুদ্ধ হয়েছিল) যদ্ধ করার ১০ দিন পর ভীষ্মের মনে ইচ্ছামৃত্যুর আশা জাগে। ঐ যুদ্ধে তিনি আর গুরুদেব দ্রোণ কৌরবপক্ষের হয়ে যুদ্ধ করছিলেন।

এদিকে অর্জুন পিতামহ ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার কথাটী জানতেন। তাই তিনি শিখন্ডীকে সামনে রেখে প্রবল পরাক্রান্ত বীর ভীষ্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। শিখন্ডীর স্ত্রীরূপ স্মরণ করে ভীষ্ম অস্ত্র পরিত্যাগ করেন। আর অর্জুনের ছোড়া তীক্ষ বাণ বিদ্ধ করে পিতামহ ভীষ্মের বুকে। যেহেতু কৌশল করে শিখন্ডীকে সামনে রাখায় ভীষ্ম কোন অস্ত্র প্রয়োগ করেননি। ঐ অবস্থায় অর্জুন ভীষ্মের পতন ঘটান। এভাবে পূর্বজন্মের কাশীরাজকন্যা অম্বা পরজন্মে শিখন্ডী হয়ে ভীষ্মবধের কারণ হন। এখানে উল্লেখ্য যে, পরবর্তী সময়ে দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামার খড়গাঘাতে শিখন্ডী মৃত্যুবরন করেছিলেন।
মহাভারতের চরিত্র এই শিখন্ডী এই আলোচ্য প্রবাদকথার উৎস।

প্রবাদটির অর্থঃ অর্জুন ছিলেন বীর। কিন্ত ভীষ্ম ছিলেন তার চেয়েও বড়বীর। তাঁকে পরাস্ত করার জন্য শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শক্রমে অর্জুন এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। তো এই প্রবাদটি অর্থ বিচারে “কাপুরুষ”-এর সমার্থক হলেও “যার আড়ালে থেকে খারাপ/অন্যায় কাজ করা যায়” সে-ই শিখন্ডী বলে পরিচিত হয়।

তথ্যসূত্র
১। উইকিপিডিয়া
২। মহাভারত

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ খবর

সাম্প্রতিক প্রকাশনা সমূহ

   সাম্প্রতিক খবর



»