ব্রেকিং নিউজ

আজ কখন দেখা যাবে এইচএসসির ফল?

২০১৯ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে আজ বুধবার।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রথমে সকাল ১০টায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ফলাফলের তথ্য তুলে দেওয়া হবে। পরে দুপুর সাড়ে ১২টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তথ্য জানাবে। তবে স্ব স্ব কেন্দ্র, প্রতিষ্ঠান এবং অনলাইনে একযোগে ফল প্রকাশ করা হবে দুপুর একটায়।

রেজাল্ট দেখতে এখানে ক্লিক করুন

গত ১ এপ্রিল এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। এবারে আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থী ছিল প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ। এর মধ্যে আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে শুধু এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৭৪৭ জন।

সংসারে অভাবের কারণে উচ্চ মাধ্যমিকের পর আর পড়ার সুযোগ হয়নি জয় সুদীপ ভদ্রের। তবে দারিদ্র্য দমিয়ে রাখতে পারেনি তাকে। ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে বিদেশে গিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। ১৮ বছর আগে শ্রমিক ভিসায় চলে যান সিঙ্গাপুর। তবে অদক্ষ শ্রমিক হওয়ায় তিনি বেতন কম পেতেন। বিষয়টি নিয়ে মনঃকষ্টও ছিল তার। নিজের অফিসের সামনে একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে যখন শিক্ষার্থীদের পদচারণা দেখতেন, কষ্টটা তার তখন আরও বেড়ে যেত। জয়ের ভাষায়, ‘কারিগরি শিক্ষা থাকলে নিশ্চয়ই তাকে এমন বেতন বৈষম্যের শিকার হতে হতো না।’

এরই মধ্যে সিঙ্গাপুর সরকারের পরিচালনায় বিদেশি শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিবিষয়ক একটি কোর্সের খবর পান এই বাংলাদেশি। প্রথমে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও তিনি সেখানে ভর্তি হন। বিনামূল্যে কোর্স করানোর পাশাপাশি খাবারও দেওয়া হতো। দুই মাসের প্রতি রোববার পানিরোধী কাজসহ অন্যান্য নির্মাণকাজের প্রশিক্ষণ নেন তিনি। জয়ের মতো আরও ৩০-৪০ জন অভিবাসী শ্রমিক সেখানে প্রশিক্ষণ নেন।

জয় সুদীপের মতে, বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষিত কোনো ব্যক্তির কাছে এমন প্রশিক্ষণ সত্যি চোখ খুলে দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, কোর্সটি করার পর বুঝতে পারি প্রায়োগিক জ্ঞানই আসল জ্ঞান। পরে এটির প্রেমে পড়ে যাই। তারপরই সিদ্ধান্ত নিই নিজের এলাকা হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট খুলব। 

তিনি বলেন, তবে কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। বড় ভাই কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর ভাইয়ের স্ত্রী-সন্তানের দায়িত্বও নিতে হয়। সবার ভরণপোষণ ও পড়াশোনার জন্য প্রতি মাসে অনেক টাকা পাঠাতে হতো। তাই কাজে মন দিই। তবে মনের ভেতরে লালন করতে থাকি নিজের স্বপ্নকে।

জয় বলেন, প্রথমে বিষয়টি নিয়ে স্ত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রিপা দত্তের সঙ্গে আলাপ করি। রিপা শুরুতে খুব আগ্রহ দেখালেও পরে বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয়। একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট করতে যে অর্থের দরকার তা জোগাড় করা সম্ভব নয়। পরিবার ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তো চিন্তা আছেই। 

স্ত্রীর কথা শুনে তাই হতাশ হয়ে পড়েন জয়। তিনি জানান, তবে পরের দিনই স্ত্রী তাকে কিছুটা আশার কথা শোনান। তিনি পলিটেকনিক চালুর বিষয়ে তার বাবা ও ভাইয়ের সাহায্য নিতে চান। পাশাপাশি প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ‘রিপার আয় দিয়ে সংসার চলবে, আর জয়ের টাকায় হবে পলিটেকনিক।’ তখন নির্মাণকাজ থেকে রাস্তা মেরামত সব কাজই করতেন জয়। তার মাসিক আয় ছিল প্রায় ১২০০ ডলার, যার অর্ধেকই তিনি বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন।

টানা ১১ বছর কাজ করে দেশে টাকা পাঠান অদম্য এই মানুষটি। অন্যদিকে দেশে থাকা স্ত্রী ও শ্যালক রিন্টু দত্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী খুঁজতে থাকেন। রিন্টু দত্ত বলেন, এখানকার মানুষের মধ্যে পলিটেকনিক নিয়ে প্রথম দিকে খুবই দ্বিধা কাজ করত। অবশেষে ৮-১০ জন শিক্ষার্থী ও দুই শিক্ষক নিয়ে ২০১২ সালে একটি টিনশেড ভবনে যাত্রা শুরু করে স্বপ্নের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। নাম দেওয়া হয় ‘নর্থ ইস্ট আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট’।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে তিন তলা ভবনজুড়ে বিস্তৃত। জয়ের শ্বশুরের দেওয়া জমিতে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। শ্যালক রিন্টু দত্তই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। জয়ের অনুপস্থিতিতে স্ত্রী ও শ্যালকই প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের এই সাফল্য নিয়ে সম্প্রতি চ্যানেল নিউজ এশিয়ায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। 

এ প্রতিষ্ঠানে তিনটি বিষয় পড়ানো হয়- সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং। ২০১২ সালে চালু হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি থেকে দুই ব্যাচে মোট ৫৭ শিক্ষার্থী পাস করেছে, যাদের ৮০ ভাগই নিজেদের বিষয় সম্পর্কিত চাকরি পেয়েছেন। এটিকেই বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন প্রতিষ্ঠাতা জয় সুদীপ ভদ্রের স্ত্রী ও বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রিপা দত্ত। তিনি বলেন, এলাকার বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই আর্থিক অনটনের কারণে উচ্চশিক্ষা নিতে পারে না। তাই তাদের এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চাই, যাতে চাকরির বাজারে তাদের চাহিদা থাকে। এতে এই শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি জেলারও উন্নতি হবে। 

শিক্ষার্থীরা অনেকেই বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকরা খুবই আন্তরিক। যেকোনো প্রয়োজনে তারা যে কোনো সময় ফোন দিতে বলেন। এমনকি শুক্রবারও কলেজে এসে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে দেন তারা। তারা আরও জানান, প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার খরচও অন্যান্য পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের তুলনায় কম। প্রতি সেমিস্টারে মাত্র ১০ হাজার টাকার মতো ব্যয় হয় এখানে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। 

সম্প্রতি নিজের চিকিৎসার জন্য দেশে এসেছেন নর্থ ইস্ট আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা জয় সুদীপ ভদ্র। তিনি বলেন, ১৮ বছর বিদেশে কাজ করে দেশে ফিরেছি। এখন এলাকার মানুষ আলাদা সম্মান করে। বিষয়টি নিয়ে কখনও কখনও লজ্জা পাই। জয় বলেন, এ প্রতিষ্ঠান আমার একক উদ্যোগে হয়নি। শ্বশুর জমি দিয়েছেন। স্ত্রী ও শ্যালক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। 

পরিচালক রিন্টু দত্ত বলেন, শুধু অর্থ দিয়ে এ পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠাই করেননি জয় সুদীপ- প্রতিষ্ঠানে কোন কোন বিষয় পড়ানো হবে, কোন বিষয়ের চাহিদা বেশি, কীভাবে পড়াতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে তিনি সিঙ্গাপুর থেকেই নির্দেশনা দিতেন। তার নির্দেশনা মতো কাজ করেই প্রতিষ্ঠান ও এর শিক্ষার্থীরা সাফল্য লাভ করেছে।



»