ব্রেকিং নিউজ

রোহিঙ্গাদের জন্য কাজ করবে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়কে নিয়ে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ দিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র এক সঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়েছে। গতকাল সোমবার ওয়াশিংটনে শেষ হওয়া বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম অংশীদারত্ব সংলাপে এ বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।


মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইট ও ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রচারিত যৌথ বিবৃতিতে আজ মঙ্গলবার বলা হয়েছে, মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে বাংলাদেশকে উৎসাহিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক ও রাজনীতিবিষয়ক মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ডেভিড হেইলের যৌথ সভাপতিত্বে দুই দেশের মধ্যে অংশীদারত্ব সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুই দেশের প্রতিনিধি দল মত প্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেছে। বাংলাদেশ আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং মানবাধিকার সমুন্নত রাখা এবং দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপের বিষয়ে শেখ হাসিনার ঘোষণা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। মানবাধিকার সমুন্নত রাখা এবং মানব পাচার রোধের প্রয়াস জোরালো করতে বাংলাদেশকে উৎসাহিত করছে যুক্তরাষ্ট্র। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ জানিয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে যে সব বিশেষায়িত সামরিক তথ্য বিনিময় হয়েছে, তার সুরক্ষার জন্য আলোচনা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশকে অনুরোধ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ এ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে রাজি হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের জন্য এর মূল উৎসে যাওয়ার পাশাপাশি স্বেচ্ছা, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি যে মিয়ানমারের জন্য জরুরি, তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে দুই দেশ। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য বাড়তি তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংগঠিত করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রোহিঙ্গা ও কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং সংকটের সমাধানে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ দিতে দুই দেশ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ চালিয়ে নিতে একমত হয়েছে। 

বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা বিকাশ অব্যাহত রাখবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মান ও চর্চার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শ্রম অধিকার ও কর্ম পরিবেশের নিরাপত্তায় অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশকে অনুরোধ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া একটি অবাধ, উন্মুক্ত, অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিন্ন স্বপ্ন এগিয়ে নিতে দুই দেশ নিবিড় সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে রাজি হয়েছে।

শরণার্থী হিসাবে আশ্রিত মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের নিয়ে দেশে বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এরা শরণার্থী শিবির থেকে পালিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। জড়াচ্ছে শিশু চুরিসহ নানা সামাজিক অপরাধে। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গারা গ্রামাঞ্চলে ‘ছেলে ধরা’ নামে চিহ্নিত হয়েছে। কোথাও কোথাও তারা আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদের ঘিরে এক শ্রেণির দালাল গোষ্ঠীও গজিয়ে উঠেছে। তারা বাংলাদেশের জাল পাসপোর্ট তৈরি, নাগরিকত্ব প্রদান, বিদেশে বৈধ বা অবৈধভাবে পাচার করা ছাড়াও রোহিঙ্গাদের শিশু চুরির কাজে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছাদুজ্জামান খান কামাল ইত্তেফাককে বলেন, রোহিঙ্গারা আস্তে আস্তে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এসব রোহিঙ্গা ও দালালদের যে কোন মূল্যে প্রতিহত করা হবে। কোন ধরনের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি করতে দেওয়া হবে না। এদের পিছনে কারা কাজ করছে তার অনুসন্ধান চলছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে অনেক রোহিঙ্গাকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধরে আবার শিবিরে ঢুকানো হয়েছে। সরকার রোহিঙ্গাদের উপর কঠোর নজর রাখছে বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার সময় সরকারের পক্ষ থেকে হোটেল, রাস্তা, যানবাহনে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও তল্লাশির ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা অনেকটাই শিথিল। এ সুযোগে এক শ্রেণির দালাল গোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের নিয়ে বৈধ-অবৈধ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড শুরু করে দিয়েছে।

ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা:কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ত্রিশটি ক্যাম্পে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ঢুকে পড়া এসব রোহিঙ্গারা প্রতিদিন ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছেন। ইদানীং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গা আটকের খবর পাওয়া যাচ্ছে। কাজের খোঁজ ছাড়াও শরণার্থী শিবিরের মানবেতর জীবন থেকে মুক্তি পেতে ও ধনী হওয়ার আশায় স্থানীয় দালাল চক্রের সহযোগিতায় বিদেশ পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছায় অনেক রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে যাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া রোহিঙ্গারা মাঝেমধ্যে আটক হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দালালরা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কথা থাকলেও তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।

জানা গেছে, রোহিঙ্গারা যাতে দেশের মূল জনস্রোতে মিশে যেতে না পারে সেজন্য টেকনাফ থেকে উখিয়া পর্যন্ত বসানো হয়েছে বেশ কয়েকটি চেকপোস্ট। পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এসব চেকপোস্টে তল্লাশি চালান। তবে এত সতর্কতার পরও রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য এলাকায়। জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন পেশায়। উখিয়ার ফলিয়া পাড়া সড়ক দিয়ে প্রতিদিন ভোরে রোহিঙ্গাদের কাজের সন্ধানে বের হতে দেখা যায়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির সদস্য টাকার বিনিময়ে তাদের অবাধে বাইরে যেতে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় দোকানিরা জানান, রোহিঙ্গারা আসার পর বোরকার বিক্রি বেড়ে গেছে। ক্যাম্পের নারীরা বোরকা পড়েন। বোরকা পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যাওয়ার সুবিধা আছে।

সূত্র জানায়, চলতি বছর রাজশাহীতে বোরকা পরে পাসপোর্ট করতে গিয়ে দালালসহ পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন এক রোহিঙ্গা তরুণী। বছর খানেক আগে ঢাকার সূত্রাপুর থানার পুলিশ একটি হোটেল থেকে ৫/৬ জন রোহিঙ্গা নারীকে উদ্ধার করে।

এদিকে খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় রোহিঙ্গা আর ছেলে ধরা আতঙ্ক দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। প্রতিদিনই জেলার কোন না কোন স্থানে ছেলে ধরা (শিশু চোর) রোহিঙ্গা সন্দেহে এলাকাবাসীর গণপিটুনি বা লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন এ দেশেরই বয়স্ক ভিক্ষুক ও মানসিক রোগীরা। ইতোমধ্যে ছেলে ধরা সন্দেহে ডুমুরিয়া উপজেলায় গণপিটুনিতে ষাটোর্ধ্ব এক রোহিঙ্গা বৃেদ্ধর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্ট এড়িয়ে পাহাড়-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এলাকা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। তারা এখন লোকাল ভাষা শিখে গেছে। পোশাক লোকালদের মতো পড়ছে। চেকপোস্ট দিয়ে দুই-চারজন যারা আসছে তারা স্পষ্টভাবে জায়গার নাম বলছে।

সূত্রমতে, সাধারণভাবে ধরা পড়লে ক্যাম্পে ফেরত্ পাঠানো হলেও ইয়াবা নিয়ে ধরা পড়লেই শুধু রোহিঙ্গাদের জেল হাজতে পাঠানো হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে যেসব রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম রেল স্টেশন থেকে ঢাকাগামী তুর্ণা নিশিথা এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠার প্রাক্কালে এক রোহিঙ্গা পরিবার জিআরপি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। মা ও দুই মেয়ে এবং তাদের মামাসহ মোট ৪ জন ঢাকা যাওয়ার জন্য কুতুব ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস এজেন্সির প্রতিনিধি জেয়াবুল হোসেনের সঙ্গে চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে অবস্থান নেয়। এ সময় জিআরপি সদস্যদের সন্দেহ হলে তারা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। এক পর্যায়ে তারা স্বীকার করেন যে মধ্যপ্রাচ্যে যাবার জন্য কুতুপালং ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসেছেন। নগরীর রিয়াজুদ্দিন বাজার পাখি গলির এই এজেন্সি থেকে আব্দুল হাকিমের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার জন্য রোহিঙ্গারা মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন করেছে। জাল পাসপোর্ট তৈরি করতে তাদের ঢাকায় পাঠাতে জেয়াবুলকে ব্যবহার করছিল হাকিম।

প্রসঙ্গত, ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে গত বছরের জুন থেকে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করে জাতিসংঘ। এপর্যন্ত আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গাকে পরিচয়পত্র দিয়েছে সংস্থাটি। বাকিদের পরিচয়পত্র প্রদানের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।



»