ব্রেকিং নিউজ

ভিপি নুর বলেন প্রশ্ন ফাঁস রোধে ব্যর্থ সরকার

তিন মেয়াদেই বর্তমান সরকার প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর।

রোববার দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাম্প্রতিক প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল ও পুনরায় পরীক্ষার দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ এ মানববন্ধনের আয়োজন করে।

নুর বলেন, প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে এটাই আমাদের প্রথম কিংবা নতুন আন্দোলন নয়, আমাদের আগেও অনেক ছাত্র সংগঠন এসবের প্রতিবাদ করেছে।

এর আগে প্রশ্ন ফাঁসবিরোধী আন্দোলনে তাদের ওপর হামলার বিষয় তুলে ধরে নুর বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে আমরা সরকারি ছাত্র সংগঠনের হামলার শিকার হয়েছি। সেই প্রশ্ন ফাঁসের কথা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে এবং বিতর্কিত পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় নতুন পরীক্ষা দিয়েছে।

মানববন্ধনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, সব পাবলিক পরীক্ষা পিএসসির অধীনে নিয়ে আসতে হবে, যাতে করে প্রশ্ন ফাঁস নিরসনে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া সম্ভব হয়।

এতে পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান, ফারুক হাসান, মো. আতাউল্লাহ, মশিউর রহমান এবং এপিএম সোহেলসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী বক্তব্য দেন।

মানববন্ধন থেকে তারা তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো- ১. প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের দুই ধাপের পরীক্ষা বাতিল করা। ২. প্রশ্ন ফাঁস ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা। ৩. প্রশ্ন ফাঁসে জড়িতদের সরকারি চাকরিতে অযোগ্য ঘোষণা করা।

প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক (দ্বাদশ) স্তরের শিক্ষাক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। ইতিমধ্যে শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের কাজ শুরু করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ২০২১ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রমে পাঠ্যবই দেওয়া শুরু হবে। এই পরিবর্তনে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা গুরুত্ব পাবে।

কী পড়ানো হবে, কেন পড়ানো হবে, কে পড়বে, কারা পড়াবেন, কীভাবে পড়াবেন এবং পড়ার ফলে কী হবে, তার বিস্তারিত দিকনির্দেশনা থাকে শিক্ষাক্রমে। সর্বশেষ ২০১২ সালে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা হয়েছিল। প্রায় সাত বছর পর আবারও শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। এর ফলে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আসবে। তবে জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার কথা থাকলেও বিদ্যমান পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ধরেই এই স্তরের শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন করা হচ্ছে।

শিক্ষাক্রমের পরিবর্তনের কাজটি করছে এনসিটিবি। সেখানকার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথমআলোকে বলেন, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের প্রক্রিয়া গত বছরের শেষ দিকে শুরু হয়। আর মাধ্যমিক স্তরের (মাদ্রাসাসহ) কাজটি এ বছরের প্রথম দিকে শুরু হয়।

বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে সব মিলিয়ে পাঠ্যবই ৩৩টি এবং মাধ্যমিকে ৭১টি। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থী ৪ কোটি ৪০ লাখ।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকের শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট সহযোগিতা করছে। এই স্তরের শিক্ষাক্রম পর্যালোচনার জন্য শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একদল শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেশের ৪৫টি বিদ্যালয়ে টানা তিন মাস কাজ করেন। ইতিমধ্যে প্রাথমিকের শিক্ষাক্রম পর্যালোচনার প্রতিবেদনও তৈরি করা হয়েছে।

এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমও হবে দক্ষতাভিত্তিক। যেমন একজন শিক্ষার্থী ইংরেজিতে কতটা বলতে পারল বা লিখতে পারল, সেটার ওপর বেশি জোর দেওয়া হবে। এমনিভাবে অন্যান্য বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জন কীভাবে সম্ভব, তা বলা হবে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে। এ ছাড়া যুগের চাহিদা অনুযায়ী অন্যান্য বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

অন্যদিকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম পর্যালোচনার জন্য ১৮টি জেলার ৩৬টি উপজেলার ২০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বেছে নেওয়া হয়। পর্যালোচনার কাজে যুক্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে ওই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরিচালনা কমিটির সদস্যসহ স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা বর্তমান শিক্ষাক্রমসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। মাধ্যমিকের তথ্য সংগ্রহের কাজ এ মাসের প্রথম দিকে শেষ হয়েছে। এখন তথ্য বিশ্লেষণের কাজ চলছে। এর ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। এরপর পরিমার্জনের কাজটি হবে।

সর্বশেষ ২০১২ সালে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা হয়েছিল
প্রায় সাত বছর পর আবারও শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার 
২০২১ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রমে পাঠ্যবই দেওয়া হবে 
পরিবর্তনে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা গুরুত্ব পাবে

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, আগামী বছরের মার্চের মধ্যে শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের কাজটি শেষ করা হবে। এরপর পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমের ভিত্তিতে পরের বছর (২০২১) প্রাথমিক স্তরের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ শ্রেণির বই দেওয়া হবে। ২০২২ সালে প্রাথমিকের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের সপ্তম, নবম ও একাদশ শ্রেণির বই দেওয়া হবে নতুন শিক্ষাক্রমের ভিত্তিতে। এরপর ২০২৩ সালে পঞ্চম, অষ্টমসহ অন্য শ্রেণিগুলোর বই দেওয়া হবে নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে।

প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণিই থাকছে!
২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের করা জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার কথা ছিল। এর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৬০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৩ হাজারের বেশি) ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি চালু করেছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর ২০১৬ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথ সভা করে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল। পরে এর ভিত্তিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বিদ্যমান প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা উঠিয়ে অষ্টম শ্রেণি শেষে সমাপনী পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাব করলে মন্ত্রিসভা তা নাকচ করে দেয়। এরপর আর বিষয়টি এগোয়নি।

তবে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত থেকে সরেও আসেনি। বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে। এর মধ্যেই প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণি রেখেই শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করছে সরকার। যদি এই স্তর অষ্টম শ্রেণি করা হতো, শিক্ষাক্রমের পরিবর্তনও সেভাবে ধারাবাহিকতা রেখে করা হতো। কিন্তু সেটা আর হচ্ছে না।

এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা-সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন প্রথম আলোকে বলেছেন, পঞ্চম শ্রেণি ধরেই শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা হচ্ছে। পরে যখন সিদ্ধান্ত হবে, তখন সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উচ্চ মাধ্যমিকের (এইচএসসি) ক্লাস শুরুর বাকি মাত্র দেড় মাস। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারি তত্ত্বাবধানে থাকা তিনটি পাঠ্যবই সংশোধন এবং মুদ্রণ ও বাজারজাতের টেন্ডার প্রক্রিয়াই শেষ হয়নি। নকল বই বাজারজাত ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় এবারের টেন্ডার প্রক্রিয়া বর্জন করে গত কয়েক বছর ধরে এই কাজ পাওয়া ১৭ প্রতিষ্ঠান।

যে চারটি প্রতিষ্ঠান এবার টেন্ডারে অংশ নিয়েছে তার মধ্যে আবার দুটিই নবীন। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নকল বই বাজারজাতের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনোটির বিরুদ্ধে সারা দেশে বই বাজারজাতের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এ অবস্থায় বই মুদ্রণ ও বাজারজাত প্রক্রিয়া শুরুতেই জটিলতায় পড়েছে। এরফলে ১ জুলাইয়ের আগে বই বাজারজাত করা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছে সাড়ে ১৭ লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ৯ লাখ বই মুদ্রণ ও বাজারজাতের টেন্ডার দিয়েছে।

এতে একদিকে বাকি সাড়ে ৮ লাখ বই নকলের রাস্তা তৈরি করে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে এর ফলে সরকার অন্তত পৌনে ২ কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হবে।

সরকার এইচএসসির বাংলা, বাংলা সহপাঠ এবং ইংরেজি বই প্রকাশকদের মাধ্যমে বাজারজাত করে। বাকি বইগুলোর শুধু কারিকুলাম করে দেয় সরকার। ওই কারিকুলামের আলোকে লেখা বই প্রণয়ন ও বিক্রি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

জানা গেছে, এর মধ্যে বাংলা ও ইংরেজির বিষয়বস্তু ট্রাইআউট (সারা দেশের শিক্ষকদের মতামত নেয়া) প্রায় দু’বছর আগে শেষ হয়েছে। এর আলোকে উভয় বইয়ের গদ্য-পদ্যসহ পাঠ পরিবর্তন ও হালনাগাদ হওয়ার কথা। কিন্তু দু’বছরেও শেষ হয়নি সে কাজ। ফলে এবারও আগের বই শিক্ষার্থীদের হাতে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা যুগান্তরকে বলেন, এইচএসসির ৩টি বই মুদ্রণ ও বাজারজাতে টেন্ডার হয়েছে। এতে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনটি নকলবাজ আর কোনটি নয়, তা নাম দেখে বোঝা সম্ভব হয়নি। তারা বই সারা দেশে বাজারজাত করতে পারবে কিনা সেটাও আগাম জানা সম্ভব নয়। টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি এসব দেখবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ট্রাইআউটের প্রতিবেদন নিয়ে মূল্যায়নসহ পরবর্তী কার্যক্রম চলছে। মুদ্রণের আদেশ দেয়ার আগে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কাজ শেষ হলে হয়তো সংশোধিত বই এবার যাবে।

সম্ভাব্য সংকট আঁচ করতে পেরে ১৬ মে এনসিটিবিতে বৈঠক ডাকা হয়। সেখানে গতবছর বই মুদ্রণে অংশ নেয়া ১৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা যোগ দেন।

সূত্র বলছে, এনসিটিবির পক্ষ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ নিতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে টেন্ডারে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেয়ার বিকল্প নেই।

একাধিক প্রকাশক যুগান্তরকে বলেন, বুঝে হোক আর না বুঝেই হোক- এনসিটিবি নকলকারীদের সঙ্গে মিলিয়ে আমাদের বইয়ের কাজ দিতে চাচ্ছে এখন। কোনো বৈধতা ছাড়াই যেসব প্রতিষ্ঠান নকল বই বাজারে ছাড়ে, সেসব প্রতিষ্ঠানের হাতে বই ছাপানোর লাইসেন্স থাকলে তারা আসলের চেয়ে নকল বই-ই বেশি বিক্রি করবে। তাদেরকে কোনো প্রক্রিয়ায়ই ধরার সুযোগ থাকবে না। তাই জেনেশুনে এমন ফাঁদে পা দিতে চাই না। ফলে মুদ্রণের কাজ নেয়ার এনসিটিবির অনুরোধে সাড়া দিতে পারিনি।

একজন প্রকাশক বলেন, এসএসসিতে এবার পাস করেছে সাড়ে ১৭ লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু ৯ লাখ বই মুদ্রণের টেন্ডার হয়েছে। বাকি বইগুলো নকল বিক্রি হবে- সরকারি সংস্থা এটা ধরে নিয়েই কাজে নামছে। কিন্তু আমাদের দাবি ছিল, নকল বন্ধে এনসিটিবি যদি সক্রিয় হয় তাহলে চ্যালেঞ্জ নিতে আমরা প্রস্তুত। সংস্থারটির অতীতের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এনসিটিবি মাত্র ৪টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবার পাঠ্যবই বাজারজাত করার ঝুঁকি নিয়েছে। কাজটি দুঃসাধ্য। বাজারে বইয়ের কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে। ফলে শিক্ষার্থীদের চড়া দামে বই কেনার শঙ্কাও আছে।

উল্লেখ্য, প্রতিটি বই থেকে এনসিটিবি রয়্যালিটি হিসেবে মূল্যের ১১ শতাংশ পেয়ে থাকে। সে হিসাবে ৯ কোটি বই থেকে প্রায় ৯৯ লাখ টাকা পাবে। এছাড়া প্রতিটি বইয়ের ‘নিরাপত্তা কাগজ’ বিক্রি করে পাবে আরও এক কোটি টাকা। অপরদিকে সাড়ে ৮ লাখ বই কম ছাপানোর কারণে রয়্যালিটি এবং নিরাপত্তা কাগজ বাবদ কমপক্ষে পৌনে ২ কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে সরকার। প্রকাশকরা বলছেন, নকল বই রোধ করতে পারলে কেবল প্রকাশকরা নন, সরকারও লাভবান হয়।

ট্রাইআউট ও বাংলা বই : ২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুযায়ী ২০১২ সালে নতুন কারিকুলাম তৈরি করে সরকার। তার আলোকে ২০১৪ সালে বাংলা প্রথমপত্র (পদ্য, গদ্য, উপন্যাস ও নাটক) এবং ২০১৫ সালে ইংরেজি প্রথমপত্র বই নতুনরূপে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হয়। কোনো বিষয়ে নতুন পাঠ্যবই প্রবর্তিত হলে তারপর ক্লাসে পাঠদানকারী শিক্ষকদের কাছ থেকে মতামত নেয়া হয়। এর নাম ট্রাইআউট।

গত বছর ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষকদের কাছ থেকে তেমন মতামত নিয়ে দুটি বিষয়ে আলাদা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। তাতে নানা সুপারিশ আছে। এরমধ্যে বাংলা বইয়ের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আপত্তি দিয়েছেন শিক্ষকরা।

সুপারিশে বলা হয়, শিক্ষকরা বইটির নামকরণ লেখায় ভুল ধরে বলেছেন এর নাম ‘সাহিত্য পাঠ’ না লিখে এক শব্দে ‘সাহিত্যপাঠ’ লিখতে হবে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জসীমউদদ্ীন এবং সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা বই থেকে বাদ দেয়ায় শিক্ষক-অভিভাবকদের হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা মীর মশাররফ হোসেন, ফররুখ আহমদ এবং প্রমথ চৌধুরীর লেখাও পাঠ্যবইয়ে ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করেন। এসব লেখক-সাহিত্যিকের রচনা বাদ দেয়ায় এনসিটিবির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষকরা বিষোদগার করেন বলেও প্রতিবেদনে বলা আছে।

সুপারিশে বলা হয়েছে, সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও পাঠ্যগ্রন্থে কতিপয় লেখকের রচনা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। তাদের মধ্যে, অন্নদাশঙ্কর রায়, হুমায়ূন আহমেদ, বিহারীলাল চক্রবর্তী, ডিএল রায়, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাঠ্যগ্রন্থে নারী লেখকদের মাত্র দুটি রচনা রয়েছে, এতে লিঙ্গবৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই নারী লেখকের আরও লেখা যুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।

সিলেবাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর সিলেবাস অনেকে বৈচিত্র্যহীন। এতে গদ্যে মননশীল ও সুচিন্তিত প্রবন্ধের অভাব আছে। ‘জীবন ও বৃক্ষ’ প্রবন্ধের মতো একই মানের আরও প্রবন্ধ থাকা উচিত। বিশেষ করে প্রমথ চৌধুরী কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা অনেকে দেখতে চান।

নৈতিকতা, দেশাত্মবোধ, মুক্ত ও উদার মানস গঠনের উপযোগী রচনার সন্নিবেশ থাকার পক্ষে জোরালো মত দেয়া হয়েছে। কবিতার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যহীনতার বিষয়টি অনেক বেশি। দুটি কবিতার নাম উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওইগুলো শিক্ষকদের তেমন টানে না।

তিনটি কবিতা উল্লেখ করে বলা হয় যে, ওইগুলোর ভাববিষয় একই। এছাড়া বানান, শব্দ গঠন ও প্রয়োগে ভুলভ্রান্তির কথা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ‘কার’ প্রয়োগ এবং বিদেশি শব্দের বানানে অভিন্নতা নষ্টের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।



»